![]() |
কনফুসিয়াস ছিলেেন প্রাচীন চীনের প্রখ্যাত দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৫৫১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর চীনের লু রাষ্ট্রের ছুফু শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার দর্শন ও রচনাবলী চীনসহ পূর্ব এশিয়ার জীবনদর্শনে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।কনফুসিয়াস মূলত নীতিবাদী দার্শনিক ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল শিক্ষার মূল ভিত্তি হচ্ছে নীতিজ্ঞান। এই প্রাচীন চীনা দার্শনিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।তাঁর জীবন কাহিনী নিয়ে থাকছে আজকের পর্বে।
আড়াই হাজার বছর আগেকার কথা। চীনদেশের লু রাজ্যে বাস করতেন লু শিয়াং নামে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনাপতি। মনে শান্তি ছিল না লু শিয়াং-এর। কারণ তিনি নয়টি কন্যার পিতা হলেও একটিও পুত্র সন্তান নেই তার। একদিন গ্রামের পথ দিয়ে যেতে যেতে তাঁর ভীষণ তেষ্টা পেয়েছিল। পথের পাশেই ছিল এক গরীব চাষীর কুটির। সেখানে গিয়ে পানি চাইতেই একটি কিশাের মেয়ে এসে পানি দিল। মেয়েটির নাম চেং সাই। তাকে দেখে লু শিয়াং-এর মনে হল মেয়েটি সর্ব সুলক্ষণা। এর গর্ভে নিশ্চয়ই তার পুত্র সন্তান জন্মাবে। চাষীকে তার মনের কথা জানায়।লু শিয়াং-এর ইচ্ছায় চাষী এবং তার কন্যা সম্মতি দিল। সেই রাত্রিতেই মিলিত হলেন তাঁরা। কিন্তু তাদের এই মিলনের কথা সকলের কাছে গােপন রেখে দিলেন লু শিয়াং। অবশেষে চেং সাই একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য লু শিয়াং-এর। পুত্র সন্তান জন্মের সংবাদ অন্য স্ত্রীদের কানে যেতেই তারা লু শিয়াংকে পাগল বলে ঘরে আটকে রাখল।কয়েক মাস পরেই তাঁর মৃত্যু হল।ওদিকে চেং সাই-এর কাছেই বড় হয়ে উঠতে লাগল নবজাত শিশুসন্তান। এই শিশুসন্তানই ভবিষ্যতে কনফুসিয়াস নামে সমস্ত জগতে পরিচিত হন।লু শিয়াং তাঁর প্রতিশ্রুতি মত কোন অর্থই দিয়ে যেতে পারেননি চেং সাইকে। কিন্তু তার জন্যে নিজের দায়িত্বকে অস্বীকার করলেন না চেং সাই।চরম অভাব অনটনের মধ্যেও চেং সাই স্বামীর প্রতি ছিলেন খুবই শ্রদ্ধাশীল। মনে মনে স্বামীর বংশমর্যাদা তার খ্যাতি বীরত্বের জন্য গর্ববােধ করতেন।স্কুলে যাবার বয়েস হতেই চেং কনফুসিয়াসকে স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যে শিক্ষক ছাত্র সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন কনফুসিয়াস। একদিকে যেমন তার ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রবল ইচ্ছা, অন্যদিকে অসাধারণ মেধা। শুধুমাত্র স্কুলের পাঠ্যপুস্তক পড়ে তার মন ভরত না। ধর্মের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ।মায়ের স্নেহে অভাব অনটনের মধ্যেই দিন কাটছিল কনফুসিয়াসের।তখন ১৫ বছর বয়স। হঠাৎ তার মা মারা গেলেন। কনফুসিয়াসের জীবনে মাই ছিলেন সব।তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে কনফুসিয়াস বিরাট আঘাত পেলেন।কিন্তু সেই কিশাের বয়েসেই নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, এত বড় বিয়ােগ বেদনাতেও ভেঙে পড়লেন না। আন্তরিক প্রচেষ্টায় নিজেকে সংযত রাখলেন।তখনকার প্রচলিত নিয়ম ছিল স্ত্রীকে স্বামীর পাশেই কবর দেওয়া হবে। পিতার সমাধির পাশে মায়ের দেহ সমাহিত করলেন কনফুসিয়াস। নিজের গৃহে ফিরে এসে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হতেই পরিচিত জনেরা সকলে তাকে পরামর্শ দিল পিতার সম্পত্তির অধিকার দাবি করতে।কিন্তু কনফুসিয়াসের আত্মমর্যাদাবোেধ এতখানি প্রবল ছিল, তিনি বললেন, যে সম্পত্তি পিতা আমাকে দিয়ে যেতে পারেননি তাতে আমার কোন লােভ নেই। পরবর্তীকালে কনফুসিয়াস বলতেন, আত্মমর্যাদা না থাকলে কোন মানুষই অন্যের কাছে মর্যাদা পেতে পারে না।যে মানুষের মধ্যে এই আত্মসম্মানবােধ আছে একমাত্র সেই হতে পারে প্রকৃত জ্ঞানী।মায়ের মৃত্যুতে সাময়িক অসুবিধার মধ্যে পড়লেও নিজের বিদ্যাশিক্ষা অধ্যয়ন বন্ধ করলেন কনফুসিয়াস। অল্প দিনের মধ্যেই তার জ্ঞান, পাণ্ডিত্যের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
কনফুসিয়াস থাকতেন লু প্রদেশে। এই প্রদেশের অন্যতম প্রধান শাসক চি চি-র কানেও গিয়ে পৌছেছিল কনফুসিয়াসের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি। প্রথম পরিচয়েই মুগ্ধ হলেন চি।কনফুসিয়াসের দারিদ্র্যের কথা শুনে তাঁকে হিসাব রাখবার কাজ দেওয়া হল অল্পদিনেই নিজের যােগ্যতার প্রমাণ দিলেন কনফুসিয়াস। চি খুশি হয়ে তাকে আরাে উঁচু পদ দিলেন। কিন্তু পদের কোন মােহ ছিল না কনফুসিয়াসের। তার একমাত্র আকাক্ষা ছিল জ্ঞান অর্জন। যে কোন পুঁথি পেলেই গভীর মনােযােগ সহকারে তা পড়তেন। উপলব্ধি করতে চেষ্টা করতেন তার অন্তর্নিহিত সত্য। তাই যখনই সময় পেতেন পুঁথি সংগ্রহ করতেন। যেখানেই কোন পুঁথিসন্ধান পেতেন সেখানেই ছুটে যেতেন। কনফুসিয়াসের চরিত্রের উদারতা মহত্ততার কারণে সকলেই তাকে ভালবাসত। তখন কনফুসিয়াস সবেমাত্র যৌবনের পা দিয়েছেন। সকলের পরামর্শে বিবাহ করলেন। স্ত্রীর নাম পরিচয় সব কিছুই ছিল অজ্ঞাত। তর স্ত্রীর গর্ভে এক পুত্র, দুটি কন্যা (কারাে মতে একটি কন্যা)জন্ম গ্রহণ করে। স্ত্রীর সঙ্গে কনফুসিয়াসের কি রকম সম্পর্ক ছিল তা জানা যায় না। সম্ভবত স্ত্রীর সাথে কনফুসিয়াসের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল। অনেকের মতে স্ত্রীর মৃত্যু হয়। তার কাজে খুশি হয়ে চি তাকে তার সমস্ত গবাদি পশুর দেখাশুনা করা, তাদের তত্ত্বাবধান করা, পালন করার সমস্ত দায়িত্বভার অর্পণ করলেন। আপাতদৃষ্টিতে সহজসাধ্য মনে হলেও কাজটি ছিল অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ।
কনফুসিয়াস তখন ত্রিশ বছরে পা দিয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করছিলেন প্রকৃত জ্ঞান শুধু পুঁথির মধ্যে পাওয়া যাবে না। চারপাশের জগতে ছড়িয়ে রয়েছে জ্ঞানের উপকরণ। তিনি বেরিয়ে পড়তেন শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।এই ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন চীনদেশের প্রকৃত অবস্থা। দেখলেন সমস্ত দেশ জুড়ে শুধু অভাব অনটন। রাজা, রাজপুরুষদের নৈতিক অধঃপতন। প্রতিনিয়তই এক দেশের সাথে অন্য দেশের যুদ্ধবিগ্রহ চলেছে। কোথাও শান্তি-শৃঙ্খলা নেই। নেই ন্যায়নীতি,ধর্মবােধ।গভীর চিন্তার মধ্যে দিয়ে তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন সমাজ জীবন, ব্যক্তি জীবন,
রাষ্ট্রনৈতিক জীবন-সর্বক্ষেত্রেই প্রয়ােজন শৃঙ্খলার। এই শৃঙ্খলা রয়েছে প্রকৃতির মধ্যে, ঈশ্বরের সমস্ত বিধানের মধ্যে। তাই দিন রাত্রি, সপ্তাহ, মাস, বৎসর বিজ্ঞি ঋতু একই নির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তিত হবে।কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন আইন বা দণ্ডের দ্বারা এই শৃঙ্খলাকে সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। আইন যতই কঠোর হবে ততই তাকে অমান্য করবার ইচ্ছা মানুষের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠবে। একমাত্র মানুষের অন্তরের বিবেকবোেধ নীতিবােধই তাকে সঠিক শৃঙ্খলার পথে চালিত করতে পারে। আর এই বিবেকবােধ নীতিবােধই তাকে সঠিক শৃঙ্খলার পথে চালিত করতে পারে। আর এই বিবেকবােধ তখনই মানুষের মধ্যে জাগ্রত হবে যখন ধর্মীয় চেতনা জেগে উঠবে।কনফুসিয়াসের মধ্যেকার এই উপলব্ধি, গভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা দেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দূর দূরান্ত থেকে ছাত্ররা আসতে আরম্ভ করল তার কাছে। তাদের শিক্ষাদনের জন্য তিনি একটি একাডেমি স্থাপন করলেন।কিন্তু কনফুসিয়াস শুধু জ্ঞানী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন একজন আদর্শ শাসক হতে।তাই জ্ঞানী হিসাবে যেমন ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন, অন্যদিকে সংস্কারক হিসাবে সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলিকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন। নানান বিষয়ে সুপরামর্শ দিতেন।তাঁর আকৃতি ছিল কুৎসিত। অস্বাভাবিক দীর্ঘদেহ, মাথাটি ছিল বিশাল আকৃতির, চওড়ামুখ। ছােট দুটি যথেষ্ট বড়। নাকটি ছিল স্বাভাবিক দ্বিগুণ। যখন তিনি হাঁটতেন, হাত দুটো পাখির ডানার মত দুপাশে ছড়িয়ে থাকত। পিঠটা ছিল কালাে কচ্ছপের মত।এই দৈহিক অপূর্ণতা সত্ত্বেও ভ্রমর যেমন মধুর আকর্ষণে ফুলের কাছে আসে, মানুষও তেমনি তাঁর জ্ঞানের প্রদীপ্ত শিখায় নিজেকে আলােকিত করবার জন্য শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে থাকে। শিক্ষক হিসাবে হিসাবে তার খ্যাতি ক্রমশই দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। এতদিনশুধু সাধারণ ঘরের ছেলেরাই তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করত। ক্রমশই অভিজাত ঘরের ছেলেরাও তার কাছে জ্ঞান লাভের জন্য শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে আরম্ভ করল। কনফুসিয়াস কোন দরিদ্র ছাত্রের কাছ থেকে অর্থ না নিলেও ধনীদের কাছ থেকে অর্থ নিতেন। ক্রমশই কনফুসিয়াস আর্থিক দিক থেকে সবল হয়ে উঠলেন।এই সময় আরাে একটি ঘটনায় অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে কনফুসিয়াসের প্রভাব আরাে বহুগুণ বৃদ্ধি পেল।কিন্তু আকস্মিকভাবে দেশে দেখা দিল সামরিক বিপর্যয়। প্রতিবেশী দেশের আক্রমণ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন কনফুসিয়াস। অন্য এক দেশে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। সেই রাজ্যের শাসনকর্তার নাম ছিল চিং।কনফুসিয়াসের প্রয়ােজনীয় সব ব্যবস্থাই করে দিলেন। মাঝে মাঝেই তিনি কনফুসিয়াসের কাছে এসে নানান বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। একদিন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, একজন শাসনকর্তার প্রকৃত সাফল্য কিভাবে নিরূপণ করা যায়?
কনফুসিয়াস বললেন, একজন শাসক তখনই সফল যখন তিনি প্রকৃতই শাসক। ভৃত্য সকল সময়েই ভৃত্য, পিতা প্রকৃতই পিতা, পুত্র সত্যিকারের পুত্র। ডিউক চিং উপলব্ধি করলেন কনফুসিয়াসের কথার প্রকৃত তাৎপর্য। যিনি প্রকৃতই শাসক তার মধ্যে একাধিক গুণের সন্নিবেশ ঘটবে। একটি গুণের অভাব ঘটলেও তিনি এত বলে পরিগণিত হবেন না।দীর্ঘ সাত বছর ডিউক চিং-এর রাজ্যে সুখেই দিন কাটিয়ে দিলেন কনফুসিয়াস।
কনফুসিয়াসের মৃত্যুর পর শিষ্যরা তার সমাধিস্থলকে ঘিরে মন্দির গড়ে তুলল। সেখানেই কুঁড়েঘর করে বাস করতে থাকে। তিন বছর ধরে এইভাবে তারা শােক পালন করে।কনফুসিয়াস নতুন কোন ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেননি। কোন মতবাদ বা দর্শনের দেননি। কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি ছিলেন বাস্তববাদী। যা কিছু ছিল তাকেই নতুনভাবে প্রয়ােজন অনুসারে পরিবর্তন করেছেন। যখন কেউ তাকে স্বর্গ, ঈশ্বর সম্বন্ধে প্রশ্ন করত, তিনি নিজের বুকের উপর হাত রেখে বলতেন, এখানেই আছে স্বর্গ ঈশ্বর।তিনি বলতেন, দয়া, সততা, পবিত্রতা, ভালবাসা, জ্ঞান, মহত্ত্বতা মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ।এই সব গুণের মধ্যে দিয়েই মানুষ নিজেকে দেবত্বে উন্নীত করতে পারে, অন্যের শ্রদ্ধা-ভালবাসা অর্জন করতে পারে।কনফুসিয়াসের মধ্যে এই সমস্ত গুণের সমাবেশ ঘটেছিল বলেই আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে তার শ্রদ্ধার আসন রয়েছে।



0 Comments