![]() |
জন কিটস ১৭৯৫ সালে লন্ডনের একটি আস্তাবলে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন আস্তাবল রক্ষক। সডন শহরের প্রাণকেন্দ্রে ছিল একটি আস্তাবল। এমনি একটি আস্তাবলের পরিচালক ছিলেন টমাস কিটস। নিচে আস্তাবল, উপরে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন টমাস।স্ত্রী আস্তাবলের মালিকের মেয়ে। কাজের প্রয়ােজনে টমাসকে যেতে হত মালিকের বাড়িতে।সেখানেই দুজনের দেখা, তারপর প্রেম, একদিন বিবাহ।বিবাহের এক বছর পর ১৭৯৫ সালের অক্টোবর মাসে টমাসের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়।যথাসময়ে শিশুর নামকরণ করা হল জন কিটস্।কিটসের জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই জন্ম হল তাঁর দুই ভাই জর্জ এবং টমের। তিন ভাইয়ের মধ্যে কিটস্ ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর।সাত বছর বয়সে তাকে এনফিল্ডের স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হল। কিটসের যখন নয় বছর তখন জীবনের প্রথম আঘাতের মুখোমুখি হন। ঘােড়া থেকে পড়ে মারা গেলেন তার বাবা টমাস কিটস।
![]() |
Portrait of John Keats by his friend Joseph Severn.
স্বামীর মৃত্যুর পর কিটসের মা নতুন একজনকে বিয়ে করলেন। কিন্তু অল্পদিনেই দুজনের সম্পর্কে ফাটল ধরল। এক বছরের মধ্যেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেল। ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি এসে পড়েছিলেন কিটসের মা।১৮১০ সালে মারা গেলেন কিটসের মা।কিন্তু মারা আগে নিজের অজান্তেই যক্ষার বীজ দিয়ে গেলেন সন্তানকে।মায়ের মৃত্যুর পর পিতৃ-মাতৃহীন ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব নিলেন মিস্টার এ্যাৰি। স্কুলে ফিরে এলেন কিটস। দিন-রাত পড়াশুনা নিয়ে থাকেন মাঝে মাঝে মনের খেয়ালে কবিতা লেখেন।
১৫ বছর বয়েসে স্কুলের পড়া শেষ হল। কিটসের অভিভাবকের ইচ্ছা কিটস ডাক্তারি পড়বেন।ডাক্তারি পড়বার জন্যে ভর্তি হলে মেডিকেল কলেজে। কিন্তু যাঁর মনের মধ্যে জেগে উঠেছে কবিতার নেশা, হাসপাতালের ছুরি, কাঁচি, ঔষধ, রুগী তার ভাল লাগবে কেন!সৌভাগ্য সেই সময় তার স্কুলের বন্ধু কাউডেন ক্লার্ক কিটসকে নিয়ে গেলেন সেই সময়কার খ্যাতিমান তরুণ কবি লে হান্টের কাছে।হান্টের সাথে পরিচয় (১৮১৬) কিটসের জীবনে এক উল্লেখযােগ্য ঘটনা। হান্ট কিটসের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হলেন, তাকে আরাে কবিতা লেখবার জন্যে উৎসাহিত করলেন।হান্ট একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। সেই পত্রিকাতেই কিটসের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হল। এখানে কিটসের পরিচয় হল শেলীর সাথে।ডাক্তারির মােহে নিজেকে আর বেঁধে রাখতে পারলেন না। অভিভাবকের উপদেশ গ্রাহ্য করে মেডিকেল কলেজ ছেড়ে দিয়ে স্থির করলেন সাহিত্যকেই জীবনের পেশা হিসাবে গ্রহণ করবেন।কিটস তার দুই ভাইকে নিয়ে লন্ডন ত্যাগ করে এলেন হ্যাম্পস্টেড।এখানে আসার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হান্টের সঙ্গ পাওয়া।এখানে এসে ১৮ বছরের তরুনী ফ্যানির প্রেমে পড়ে যান তিনি।অল্পদিনের মধ্যে কিটস প্রকাশ করলেন তার প্রথম কবিতা সংকলন। সকলের মনে আশা ছিল, এই বই নিশ্চয়ই জনপ্রিয় হবে। কিন্তু দুভার্গ্য কিটসের, পরিচিত কিছু লােকজন ছাড়া এই বই-এর একটি কপিও বিক্রি হল না।প্রথম কাব্য সংকলনের ব্যর্থতায় সাময়িক আশাহত হলেন কিটস্ কিন্তু অল্পদিনেই নতুন উৎসাহে শুরু করলেন কাব্য সাধনা। লেখা হল প্রথম দীর্ঘ কবিতা এন্ডিমিয়ন(Endumion 1817)।এ এক অসাধারণ কবিতা। এই কবিতার প্রথম লাইনের মধ্যেই কিটসের জীবন দর্শন ফুটে উঠেছে।A thing of beauty is joy forever.
ইতিপূর্বে কখনাে দেশভ্রমণে যাননি কিটস, তাই বন্ধুর সাথে বেরিয়ে পড়লেন। ভ্রমণ শেষ করে ফিরে আসতেই দেখলেন তার ভাই টম গুরুতর অসুস্থ।ঠিক এই সময়েই প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর এন্ডিমিয়ন (১৮১৭)। কিটস্ আশা করেছিলেন তাঁর এই কবিতা নিশ্চয়ই খ্যাতি পাবে। কিন্তু তৎকালীন দুটি পত্রিকা ব্ল্যাকউড ম্যাগাজিন এবং কোয়াটার্লি রিভিয়ু তীব্র ভাষায় কিটসের নামে সমালােচনা করল। জঘন্য সে আক্রমণ। এই তীব্র বিদ্বেষপূর্ণ সমালােচনা প্রকৃত পক্ষে কিটসের মানসিক শক্তিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল।একদিকে যখন পত্রিকার সমালােচনায় ভেঙে পড়েছেন কিটস, সেই সময় এল আরেক আঘাত। ১৮১৮ সালের ১ লা ডিসেম্বর মারা গেল টম।কিটস্ স্থির করলেন যেমন করেই হােক তাকে অর্থ উপার্জন করতেই হবে। স্বাস্থ্য আগের মত ভাল যাচ্ছিল না। কিন্তু মনের অদম্য শক্তিতে কিটস্ লিখে চললেন একের পর এক কবিতা।প্রকৃতপক্ষে কিটসের জীবনের সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবিতা এই সময়েই লেখা।আর্থিক অবস্থাও ভাল যাচ্ছিল না কিটসের। কিটসের শরীর যতই ভেঙে পড়ছিল তার স্ত্রী ফ্যানি ততই তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। তার সাজ-গােজ হাসি অন্য ছেলেদের সাথে মেলামেশা কিটস্ সহ্য করতে পারতেন না। তার সমস্ত অন্তর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেত।তিনি ফিরে এলেন লন্ডনে।। একদিন বাইরে বেড়াতে বেরােলেন কিটস। বাড়িতে ফিরে কাপুনি দিয়ে জ্বর এল, সেই সাথে কাশি।এক ঝলক রক্ত উঠে এল মুখ দিয়ে।কিটস্ বললেন,একটি মােমবাতি নিয়ে এস। ব্রাউন মােমবাতি নিয়ে আসতেই কিটস্ কিছুক্ষণ রক্তের দিকে চেয়ে বললেন, এই রক্তের রং আমি চিনি, এ রক্ত উঠে এসেছে ধমনী থেকে। এই রক্ত আমার মৃত্যুর শমন। ডাক্তার এল। সে যুগে যার কোন চিকিৎসা ছিল না। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে শিরা কেটে কিছুটা রক্ত বার করে দেওয়া হল। কিন্তু তাতে কোন সুফল দেখা গেল না।তখন তার বয়স মাত্র পঁচিশ। গলার স্বর ভেঙে গিয়েছিল, মাঝে মাঝেই জ্বর হত, গলা দিয়ে রক্ত উঠে আসত, এই সময় তার সৃষ্টির উৎসও ফুরিয়ে আসছিল।এই সময় প্রকাশিত হল কিটসের তৃতীয় ও শেষ কাব্য সংকলন। এই কবিতাগুচ্ছ কিটসকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের পাশে স্থান দিয়েছে।এই সংকলনে একদিকে ছিল বড় কবিতা অন্যদিকে ছােট কিছু কবিতা, সনেট।কিটসের কিছু উল্লেখ যােগ্য সৃষ্টিকর্ম হলঃইসাবেলা(Isabella or the Pot of Basil 1818),Hyperion -গ্রীক পুরাণের কাহিনী অবলম্বন করে লেখা দীর্ঘকাব্য। The Eve of St, Agnes কিটসের আরেকটি বড় কবিতা The Eve of Saint Mark .. এটি অসমাপ্ত।এই সব দীর্ঘ কবিতার পাশাপাশি রচিত তার ছােট কবিতা (ode) গুলির মধ্যে ফুটে উঠেছে এক অনন্য সৌন্দর্য।Ode on a Grecian urn,Ode on Melancholy, Ode to Autumn.Ode to Nightingale ইত্যাদি।এই কবিতাগুলি যেন মানব জীবনেরই রূপক। এখানে জীবন মৃত্যুর স্রোত পাশাপাশি বয়ে চলেছে।Ode to Autumn— এতে এক বিপরীত ধারণা ফুটে উঠেছে, এখানে কবি প্রকৃত সৌন্দর্য খুঁজে বেরিয়েছেন।Ode On A Gracian Urn এ কিটসের একটি বিখ্যাত উক্তি হলঃBeauty is truth, truth beauty that is all Ye know on earth, and all ye need to know...
কবিতা ছাড়া কিটস্ কোন গদ্য লেখার চেষ্টা করেননি। তাঁর কাব্য জীবন ছিল মাত্র ছয় বছর
(১৮১৪-১৮১৯)। অর্থাৎ উনিশ থেকে চবিবশ বছর বয়স। ১৮২০ সাল। কিটসের দেহ ক্রমশই ভেঙে পড়ছিল। তাকে নিয়ে আসা হল ফ্যানিদের বাড়িতে। ইটালিতে যাবার আগে এক মাস তিনি ফ্যানির নিবিড় সান্নিধ্যে পেয়েছিলেন।১৮২০ সালের ১৩ ই সেপ্টেম্বর কিটস্ রওনা হলেন ইটালির দিকে। দীর্ঘ সমুদ্র পথ পার হতে সপ্তাহ লাগল। জাহাজে যেতে যেতে কিটস মুক্ত আকাশের দিকে চেয়ে থাকতেন।চোখে পড়ত ধ্রুবতারা। মনে হত মৃত্যুর পর তিনি ঐ ধ্রুবতারার সাথে একাত্ম হয়ে যাবেন।২৩ শে ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ১৯২১ সাল। সমস্ত দিন কেমন আচ্ছন্ন ছিলেন কিটস্ রাত তখন প্রায় এগারােটা, মাথার পাশে বসেছিল বন্ধু সেভার্ন। আস্তে আস্তে কিটস্ বললেন, “ আমাকে তুলে ধর, আমার মৃত্যু এগিয়ে এসেছে। আমি শান্তিতে মরতে চাই, তুমি ভয় পেও না — ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, অবশেষে মৃত্যু এল।" সেভার্নের কোলেই চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়লেন চিরসুন্দরের কবি কিটস। পরদিন রােমের এক সমাধিক্ষেত্রে তাঁকে সমাধি দেওয়া হল।দু-বছর পরে এই সমাধিক্ষেত্রেই সমাধি দেওয়া হয় বিখ্যাত কবি শেলীকে, যিনি তার প্রিয়তম বন্ধু কিটসের মৃত্যুর পর থেকে অনেকটাই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন।
![]() |
| Gravestone of John Keats in the Protestant Cemetery, Rome, Italy. |



0 Comments