আর্কিমিডিস ছিলেন একজন গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক।তাঁর জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে তবুও তাকে ক্ল্যাসিক্যাল যুগের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর্কিমিডিসকে সাধারণত প্রাচীন যুগের সেরা এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা গণিতজ্ঞ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।পানি তোলার জন্য আর্কিমিডিসের স্ক্রু পাম্প, যুদ্ধকালীন আক্রমণের জন্য সীজ ইঞ্জিন ইত্যাদি মৌলিক যন্ত্রপাতির ডিজাইনের জন্যও তিনি বিখ্যাত। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় তার নকশাকৃত পাশাপাশি রাখা একগুচ্ছ আয়নার সাহায্যে জাহাজে অগ্নিসংযোগের পদ্ধতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।তিনি হলেন অংকশাস্ত্রের জনক ও তিনিই ইউরেকা নামক শব্দটিকে সবার কাছে পরিচিত করেছেন।তিনি এবং তাঁর সমগ্র জীবন ছিল বিস্ময়কর ও অসংখ্য মজার ঘটনাবহুল যদিও তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।মহাবিজ্ঞানী আর্কিমিডিসকে নিয়ে বিস্তারিত থাকছে আজকের পর্বেঃ
প্রাচীন সাইরাকিউস অঞ্চলের(ইতালি) সম্রাট হিয়েরাে এক স্বর্ণকারকে দিয়ে একটি সােনার মুকুট তৈরি করেছিলেন।মুকুটটি হাতে পাওয়ার পর সম্রাটের মনে হল এর মধ্যে খাদ বা ভেজাল মিশানাে আছে। কিন্তু স্বর্ণকার খাদের কথা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু সম্রাটের মনের সন্দেহ থেকেই গেল।তিনি সত্যটি জানার জন্য বিষয়টি সমাধানের ভার দিলেন রাজদরবারের একজন বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের উপর।কিন্তু এতে মহাভাবনায় পড়ে গেলেন আর্কিমিডিস। সম্রাট কিন্তু শর্ত জুড়ে দিয়েছিল যে, মুকুটের কোন ক্ষতি করা যাবে না।আর্কিমিডিস ভেবেও কূল-কিনারা পাচ্ছিলেন না যে, মুকুট না ভেঙে কেমন করে মুকুটের খাদ বা ভেজাল নির্ণয় করবেন। কয়েকদিন কেটে গেল।অস্থির হয়ে ওঠেন আর্কিমিডিস।একদিন দুপুরবেলায় মুকুটের কথা ভাবতে ভাবতে আর্কিমিডিস সমস্ত পােশাক খুলে চৌবাচ্চায় স্নান করতে নেমেছেন।পানিতে শরীর ডুবতেই আর্কিমিডিস লক্ষ্য করলেন, কিছুটা পানি চৌবাচ্চা থেকে উপচে পড়ল।মুহূর্তে তার মাথায় এক নতুন চিন্তার উন্মেষ হল।এক লাফে চৌবাচ্চা থেকে উঠে পড়লেন। তিনি ভুলে গেলেন তার শরীরে কোন পােশাক নেই। সমস্যা সমাধানের আনন্দে নগ্ন অবস্থাতেই ইউরেকা বলতে বলতে ছুটে গেলেন রাজ দরবারে।মুকুটের সমান ওজনের সােনা নিলেন ও একপাত্র পানিতে মুকুটটি ডােবালেন। দেখা গেল খানিকটা পানি উপচে পড়ল।এইবার মুকুটের ওজনের সমান সােনা নিয়ে জলপূর্ণ পাত্রে ডােবানাে হল। যে পরিমাণ পানি উপচে পড়ল তা ওজন করে দেখা গেল আগের উপচে পড়া পানি থেকে তার ওজন আলাদা।আর্কিমিডিস বললেন, মুকুটে খাদ মেশানাে আছে। কারণ যদি মুকুট সম্পূর্ণ সােনার হত তবে দুটি ক্ষেত্রেই উপচে পড়া পানির ওজন সমান হত।এই আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হল একটি বৈজ্ঞানিক সূত্র।
“ তরল পদার্থের মধ্যে কোন বস্তু নিমজ্জিত করলে সেই বস্তু কিছু পরিমাণে ওজন হারায়। বস্তু যে পরিমাণে ওজন হারায়, সেই পরিমাণ ওজন বস্তুর অপসারিত তরল পদার্থের ওজনের সমান।”এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আর্কিমিডিসের সূত্র নামে বিখ্যাত ও আমরা সকলেই পড়েছি।তিনি গোলীয় দর্পণের সাহায্যে সূর্যের রশ্মি কেন্দ্রীভূত করে আগুন ধরানোর কৌশলও জানতেন। এক খণ্ড লোহা জলে ডুবে যায়, অথচ লোহার তৈরি জাহাজ জলে ভাসে অনায়াসে কী ভাবে? এর সমাধানও তিনি দিয়েছেন।

আর্কিমিডিসের জন্ম আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৮৭ সালে। সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত সাইরাকিউস দ্বীপে।পিতা ফেইদিয়াস ছিলেন একজন জ্যোতির্বিদ।কৈশাের ও যৌবনে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় গিয়ে পড়াশুনা করেছেন।সেই সময় আলেকজান্দ্রিয়া ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার তীর্থস্থান।ছাত্র অবস্থাতেই আর্কিমিডিস তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও সুমধুর ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর গুরু ছিলেন ক্যানন।ক্যানন ছিলেন জ্যামিতির জনক মহান ইউক্লিডের ছাত্র। পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনিও চেয়েছিলেন গণিতবিদ হবেন। অঙ্কশাস্ত্র, বিশেষ করে জ্যামিতিতে তার আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি।ইউক্লিড, ক্যানন যেখানে তাদের বিষয় সমাপ্ত করেছিলেন আর্কিমিডিস সেখান থেকেই আরম্ভ করেছিলেন।আর্কিমিডিস যুদ্ধকে ঘৃণা করতেন কারও আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করাও তাঁর প্রকৃতি বিরুদ্ধ ছিল।কিন্তু যেহেতু তিনি ছিলেন সাইরাকিউসের প্রজা এবং সম্রাট হিয়েরার রাজ কর্মচারী তাই নিরুপায় হয়েই তাকে সম্রাটের আদেশ মেনে চলতে হত।সম্রাটের আদেশেই তিনি প্রায় ৪০ টি আবিষ্কার করেন। তার মধ্যে কিছু ব্যবসায়ীক জিনিস হলেও অধিকাংশই ছিল সামরিক বিভাগের জন্য প্রয়ােজনীয়।
আর্কিমিডিসের একটি জনপ্রিয় আবিষ্কার পুল ও লিভার।একবার কোন একটি জাহাজ সমুদ্রের পাড়ে এমনভাবে আটকে গিয়েছিল যে সেটিকে কোনভাবেই পানিতে ভাসানাে সম্ভব হচ্ছিল না।আর্কিমিডিস ভালভাবে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে তাঁর মনে হল,একমাত্র যদি এই জাহাজটাকে উঁচু করে তােলা যায় তবেই জাহাজটাকে পানিতে ভাসানো সম্ভব হবে।আর্কিমিডিসের কথা শুনে সকলে হেসেই উড়িয়ে দিল।অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই উদ্ভাবন করলেন লিভার আর পুলি।জাহাজ ঘাটে এটা উঁচু জায়গার লিভার খাটাবার ব্যবস্থা করলেন।তার মধ্যে বিরাট একটা দড়ি বেঁধে দিলেন। দড়ির একটা প্রান্ত জাহাজের সঙ্গে ভালকরে বাঁধা হল।এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে সম্রাট হিয়েরাে নিজেই এলেন জাহাজ ঘাটায়।যেখানে যত মানুষ ছিল সকলে জড় হয়েছিল সেখানে। আর্কিমিডিস সম্রাটকে অনুরােধ করলেন লিভার লাগানাে দড়ির আরেকটা প্রান্ত ধরে টান দিতে।আর্কিমিডিসের কথায় সম্রাট তার সমস্ত শক্তি দিয়ে দড়িটা ধরে টান দিলেন। সাথে সাথে অবাক কাণ্ড।নড়ে উঠল জাহাজটা।চারদিক স্তব্ধ ও সকলেই বিস্মিত হয়ে গেল।এবার সম্রাটের সাথে দড়িতে হাত লাগালেন আরাে অনেকে।সকলে মিলে টান দিতেই সত্যি সত্যি জাহাজ শুন্যে উঠতে আরম্ভ করল। সম্রাট আনন্দে বুকে জুড়িয়ে ধরলেন আর্কিমিডিসকে।এই আবিষ্কারের ফলে বড় বড় পাথর, ভারী জিনিস, কুয়া থেকে জল তােলার কাজ সহজ হল।একবার আর্কিমিডিস গর্ব করে বলেছিলেন,"আমি যদি পৃথিবীর বাইরে দাঁড়াবার একটু জায়গা পেতাম তবে আমার এই লিভার পুলির সাহায্যে পৃথিবীটাকেই নাড়িয়ে দিতাম।"

একবার রোমান সেনাপতি কর্তৃক সাইরাকিউস অধিকৃত হয়েছিল। রোমান সেনাপতি মহান বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস কে স্বচক্ষে দেখার জন্য সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, আর্কিমিডিসকে যেন হত্যা করা না হয়। বরং তাঁকে যেন সসম্মানে রাজদরবারে নিয়ে আসা হয়। সেনারা কেউ আর্কিমিডিসকে চিনত না ।হন্যে হয়ে খুঁজেও যখন বিজ্ঞানীর সন্ধান মিলল না, তখন তারা এক বৃদ্ধকে দেখল খুব মনোযোগ দিয়ে নিজের ঘরের মেঝেতে গোল গোল কী যেন আঁকছে। তারা কৌশলে এই বৃদ্ধ কেই রাজদরবারে হাজির করতে চাইল আর্কিমিডিস পরিচয়ে।সেনাদের একজন বৃদ্ধকে তাদের সঙ্গে যেতে হুকুম করল।কিন্তু বৃদ্ধ মাথা না তুলেই বললেন ব্যস্ত আছি।এ ধরণের কথা শােনবার জন্য প্রস্তুত ছিল না রােমান সৈন্যটি।তাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তাকে সেটি পালন করতেই হবে।আর্কিমিডিসের হাত ধরতেই এক টানে ছাড়িয়ে নিলেন আর্কিমিডিস।আমার কাজ শেষ না হলে কোথাও যেতে পারব না।আর সহ্য করতে পারল না সৈনিক। পরাজিত দেশের এক নাগরিকের এতবড় স্পর্ধা, তার হুকুম অগ্রাহ্য করে!একটানে কোমরের তলােয়ার বের করে মূর্খ সৈনিক ছিন্ন করল মহাবিজ্ঞানীর মাথা।রক্তের ধারায় শেষ হলে গেল তার অসমাপ্ত কাজ।আর্কিমিডিসকে হত্য করা হয়েছিল সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব২১২ সালে।বিজ্ঞানীর ছিন্ন মুণ্ড দেখে গভীরভাবে দুঃখিত হয়েছিলেন মার্কিউলাস।তিনি যথাযথ মর্যাদার সাথে আর্কিমিডিসের দেহ সমাহিত করেন।
মহাবিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের আবিষ্কার সম্বন্ধে সঠিক কোন তথ্য ভালকরে জানা যায় না।প্রাচীনকালে আর্কিমিডিসের গাণিতিক রচনাগুলি তাঁর উদ্ভাবনগুলোর মত পরিচিত ছিল না। আলেকজান্দ্রিয়ার গণিতবিদরা তার লেখা পড়েছেন, বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখও করেছেন, কিন্তু আনুমানিক ৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে গ্রিক স্থপতি ইসেডোর অফ মিলেতাস সর্বপ্রথম তার সকল রচনা একত্রে লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রিক গণিতবিদ ইউতোশিয়াস আর্কিমিডিসের কাজের উপর একটি বিবরণ প্রকাশ করেন, যা তাকে প্রথমবারের মত বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে পরিচিত করে তোলে। আর্কিমিডিসের কাজের খুব কম লিখিত দলিল মধ্যযুগের পর অবশিষ্ট ছিল। কিন্তু সেই অল্পকিছু দলিলই পরবর্তীকালে রেনেসাঁ যুগের বিজ্ঞানীদের কাছে খুবই উপকারী বলে বিবেচিত হয়।১৯০৬ সালে আর্কিমিডিসের একটি নতুন পাণ্ডুুুলিপি আবিষ্কৃত হয় যা তার গাণিতিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতির উপর নতুনভাবে আলোকপাত করে। সামরিক প্রয়ােজনে যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করলেও ঐ বিষয়ে তার কোন আগ্রহ ছিল না। মূলত গাণিতিক বিষয়েই ছিল তাঁর মূল আগ্রহ। দিনের অধিকাংশ সময়ে তিনি গবেষণায় নিমগ্ন থাকতেন। বাইরের জগতের সব কথাই তিনি তখন ভুলে যেতেন। এমন বহু সময় গিয়েছে তাঁর কাজের লােক তাকে খাবার দিয়ে গিয়েছে, সারাদিনে তিনি সেই কাবার স্পর্শ করেননি। ভুলেই গিয়েছেন খাবার কথা। আবার কখনাে স্নান করতে গিয়ে ঘন্টার পর ঘণ্টা সেখানেই কাটিয়ে দিতেন। খােজ করতে দেখা গেল তিনি স্নানাগারের দেওয়ালেই অঙ্ক কষে চলেছেন। বলবিদ্যা, জ্যামিতি, জ্যোতিবিদ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর রচনার সংখ্যা বারােটি। এছাড়াও তিনি আর যে সমস্ত রচনা করেছিলেন আর কোন সন্ধান পাওয়া যায় না।গণিত সংক্রান্ত ব্যাপারে আর্কিমিডিসের আরও কিছু উল্লেখযােগ্য আবিষ্কার হলঃবৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত নির্নয়,অধিবৃত্তীয় অংশগুলাের ক্ষেত্রফল নির্ধারণ করেছিলেন,শঙ্ককৃতি এবং গােলাকৃতি বস্তুর সম্বন্ধে ৩২ টি প্রতিজ্ঞা উদ্ভাবন করেছিলেন, বলবিদ্যার তত্ত্বের ভীত হিসাবে সমতল ক্ষেত্রের সাম্যতা সম্বন্ধে সূত্র ইত্যাদি।তার বহু আবিষ্কৃত তথ্যগুলো আজও বিজ্ঞানীদের সঠিক দেখায়।
0 Comments