![]() |
| ছবিঃ১৯৪০ সালে প্যারিসে কয়েকজন নাৎসি কর্মকর্তা ও হিটলার |
কিন্তু এই বোমার আবিষ্কারের পিছনে রয়েছে রোমাঞ্চকর ইতিহাস যা সত্যিই পারমানবিক বোমার মতই বিস্ময়কর ও রহস্যময়।
২য় বিশ্বযুদ্ধ ও ২ জন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর লড়াই নিয়ে আজকের এই পর্বঃ
![]() |
| ছবিঃ১৯৩৩ সালে ক্ষমতা গ্রহনের পর হিটলার। |
১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে ক্ষমতা গ্রহন করেন আডলফ হিটলার।১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলার ও তার নাৎসি পার্টির পোল্যান্ড আক্রমনের মধ্য দিয়ে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটে।সমগ্র ইউরোপে জার্মানির আক্রমণ চললেও হাইজেনবার্গসহ বড় অনেক বিজ্ঞানীরা জার্মানি ত্যাগ করলেন না।৩ সেপ্টেম্বর ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।পরর্বতী কয়েকমাসে জার্মানি সমগ্র ইউরোপজুড়ে আক্রমন চালাতে শুরু করে।১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি পার্ল হারবারে আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র ডিসেম্বরেই যোগদান করে।
![]() |
| ছবিঃপার্ল হারবার আক্রমনের পর দৃশ্য। |
শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী আইন্সটাইনের সূত্র (E=mc2) এর উপর গবেষনা করে জার্মান বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ প্রথমে পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের সর্ম্পকে ধারনা দেন এবং জার্মানি প্রথমে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করে।হাইজেনবার্গ কতৃক পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের বিষয়টি জানানোর পরই হিটলার ও নাৎসি বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুধাবন করেন।তাদের তিনি বলেন, ইউরেনিয়ামের চেইন বিক্রিয়া ঘটিয়ে একটি অকল্পনীয় শক্তিশালী বোমা বানানো সম্ভব যা দ্বারা একটি শহরকে মুহুর্তেই ধ্বংস করা যাবে।তারা বক্তব্যটি শুনে সাথে সাথে জানতে চাইল, এই শক্তিশালী বোমা বানাতে আপনার কতদিন লাগবে?হাইজেনবার্গ উত্তরে বলেছিলেনঃতথ্যটা সহজ হলেও পদ্ধতিটা কঠিন। অনেক সমস্যা আছে যার সমাধান করতে হবে।অনেক প্রশ্নের উত্তর রয়েছে, যা এখনো জানার বাকি। এই সবকিছু নিয়ে গবেষনা করার পর এই বোমা আবিস্কার সম্ভব কি না তা জানা যাবে।তারা হাইজেনবার্গকে কাজ করার অনুমতি দেয় এবং হাইজেনবার্গও কাজে ঝাপিয়ে পড়েন।হাইজেনবার্গ ছিলেন তখনকার সময়ের শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানীদের একজন, যেই কারণে তাঁর উপর নাৎসিরা ভরসা করতেই পারে।তাকে বলা হয় "কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জনক" এবং তিনি ১৯৩২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেছিলেন।
![]() |
| ১৯৪২ সাল,লন্ডন।ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাসার কাছের রাস্তায় এইভাবেই বসে ছিল ৩ টি শিশু। |
১৯৪১ সালের অক্টোবরে ১২৫০ টন ইউরেনিয়াম আকরিক জাহাজে করে বেলজিয়ামের অধীনে থাকা আফ্রিকার দেশ কংগো থেকে নিউইয়র্কে আনা হয়।এই ইউরেনিয়ামের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন দেশের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা।তারা ইউরেনিয়াম দ্বারা পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের বিষয়ে গবেষনা করে জার্মানদের আগে পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার করার চেষ্টা করবেন।এটি ছিল অত্যন্ত গোপন পরিকল্পনা। এই প্রকল্পটিই হচ্ছে ঐতিহাসিক ম্যানহাটন প্রজেক্ট।
![]() |
| ছবিঃ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ঘোষনার মুহূর্তে হিটলার। |
ম্যানহাটন প্রজেক্ট পরিচালনার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রবার্ট ওপেনহেইমার নামের একজন বিজ্ঞানীকে, যিনি ইউনির্ভাসিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়াতে অধ্যাপনা করতেন।উচ্চাভিলাষী জীবন ও উচ্চবেতনের চাকরি করলেও তিনি নিজে বড় কিছু করার স্বপ্ন সবসময়ই দেখতেন।তখনকার সময়ের জেনারেল লেসলি গ্রোভস প্রজেক্টের মূল দায়িত্ব দেওয়ার জন্য এমন একজন দক্ষ বিজ্ঞানীকে খুঁজছেন, যিনি ম্যানহাটন প্রজেক্টের বাকী সব বিজ্ঞানীকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন। ওপেনহেইমারই ছিলেন একমাত্র ব্যাক্তি যার উত্তর জেনারেল গ্রোভসকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল।গ্রোভস যখন ওপেনহেইমারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,প্রেসিডেন্ট যদি আপনার কাছে জানতে চায়,পারমানবিক বোমা আবিষ্কার করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩ টি চ্যালেঞ্জ কি তখন আপনি কি বলবেন?উত্তরে ওপেনহেইমার, যা বলেছিলেন, তা শুনে গ্রোভস বুঝতে পেরেছিলেন যে, পারমানবিক বোমা আবিষ্কার করতে কি কি করা দরকার তা ওপেনহেইমারের চেয়ে ভাল কেউই জানে না।সেমিনার ও অধ্যাপনা ছাড়া অন্য কোন জটিল কাজের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ওপেনহেইমার এমন একটি আবিষ্কারের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, যা তাকে তাঁর স্বপ্ন পূরনের পথে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছিল।
১৯৪২ সালে যখন একদিকে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধ চলছে তখন অন্য দিকে বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ ও ওপেনহেইমার নিজেদের মধ্যে পারমানবিক আবিষ্কারের যুদ্ধে নেমে পড়েছিলেন।জার্মানির হাইজেনবার্গ যখন পারমানবিক আবিষ্কারের প্রথম পর্যায় সম্পূর্ণ করলেন তখন আমেরিকা কেবলমাত্র কাজ শুরু করেছে।জার্মানদের পারমানবিক আবিষ্কারের কাজের অগ্রগতি সর্ম্পকে আমেরিকার অনুমান করা ছাড়া খবর পাওয়ার অন্য কোন উপায় ছিল না ।কিন্তু তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন পারমানবিক আবিষ্কার করে যুদ্ধে জার্মানদের পরাজিত করতে।
![]() |
| ওপেনহেইমার ও গ্রোভস প্রজেক্টের জায়গা পরিদর্শনের সময় |
১৯৪২ সালে জেনারেল গ্রোভস ও ওপেনহেইমার ম্যানহাটন প্রজেক্টের জন্য একটি বড়, জনমানবশূন্য, বিস্তৃত ফাঁকা জায়গার খোঁজ শুরু করলেন।ওপেনহেইমার জেনারেল গ্রোভসকে ঠিক এমনই একটি জায়গার সন্ধান দেন, যেখানে ওপেনহেইমারের ছোটবেলা কাটিয়েছিলেন।তিনি গ্রোভসকে সাথে নিয়ে আসলেন নিউমেক্সিকোর একটি শহর যার নাম লস এলামোস।এই বিস্তৃত মরুভূমিতে ওপেনহেইমার প্রজেক্টের সকল বিজ্ঞানীদের নিয়ে আসলেন এবং প্রথম বৈঠকে বসলেন।তিনি সেদিন তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেনঃ
আপনাদের এই জনমানবশুন্য মরূভূমিতে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হল, আমরা এমন একটি সামরিক অস্ত্র আবিষ্কার করার চেষ্টা করব, যেটির গবেষনা এবং পরীক্ষার জন্য এমন গোপন ও ফাঁকা জায়গার প্রয়োজন।বর্তমানে সারা পৃথিবীতে যুদ্ধ চলছে।প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ এবং সেন্য মারা যাচ্ছে।আমরা এমন একটি অস্ত্র আবিষ্কার করার চেষ্টা করব, যা এই সবকিছুরই সমাধান করে দিতে পারে।আপনাদের মত মেধাবীদের অত্যন্ত প্রয়োজন এই যুদ্ধের ও মৃত্যুর খেলা শেষ করতে।
বিজ্ঞানী রর্বাট ওপেনহেইমার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার সময়কার দেশের শ্রেষ্ঠ পদার্থবিদ ও বিজ্ঞানীদের।।ইউরেনিয়াম-২৩৫ খুবই দুর্লভ মৌল হওয়ায় বেশি
পরিমানে সংগ্রহ যাচ্ছিল না যে জন্য ১ টির বেশি বোমা তৈরী করা সম্ভব না বলে জানান ওপেনহাইমার তার দলকে।এই কারনে তিনি অন্য একটি মৌলের উপর নজর দেন যেটি হচ্ছে প্লুটোনিয়াম।ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর জন্য অপেক্ষা করে সময় নষ্ট না করে বিকল্প চিন্তা করলেন কারন নাৎসিরা যদি আগে পারমাণবিক আবিষ্কার করতে পারে তাহলে তারা যে সম্পুর্ণ পৃথিবীতে অশান্তি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে তা অনুধাবন করা কারো পক্ষে কঠিন কিছুই ছিল না। হিটলার তার ভাষনে "যুদ্ধকে শান্তি" বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
১৯৪২ সালে হাইজেনবার্গ প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে ইউরেনিয়ামের চেইন বিক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে পেরেছিলেন।কিন্তু এতে তিনি খুবই কম সংখ্যক পরমানুকে ব্যবহার করেছিলেন পরীক্ষার জন্য।এই পরীক্ষায় সফলতা লাভের পর শক্তিশালী বোমা বানাতে আরও অনেক বেশি ইউরেনিয়াম ও বড় আকারের চেইন বিক্রিয়া ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
কিন্তু বেশি পরমানুর চেইন রিয়েকশনের সময় সামান্য ত্রুটিতে তিনি এবং তার দল সমস্যায় পড়ে যান। তার ল্যাবে ছোট আকারের বিস্ফোরণ ঘটে এবং অল্পের জন্য প্রানে রক্ষা পান হাইজেনবার্গ ও তাঁর সাথীরা।তাদের সম্পুর্ন গবেষনাগার ধ্বংস হয়ে যায়।কিন্তু আমেরিকা এই ঘটনার বিষয়ে ভুল তথ্য পায় এবং তারা ভেবে বসে জার্মানরা সম্ভবত পারমানবিক আবিষ্কার করে ফেলেছে।কিন্ত এই ভুল খবরটিই ওপেনহেইমারদের কাজের গতি আরও শতগুন বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে বিজ্ঞানী ওপেনহেইমারও পারমানবিক আবিষ্কারের পথে অনেক বড় একটি বাধার সম্মুখীন হন।তারা প্লুটোনিয়াম বোমার বিস্ফোরণ কিভাবে ঘটাবেন সমাধান বের করতে পারছিলেন না।এই সমাধান বের না করতে পারলে তারা কোনভাবেই বোমা ব্যবহার করতে পারবেন না। তিনি হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন।লস এলামোসে অনেকটা নীরবতা বিরাজ করছিল।ওপেনহাইমার পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগের বিষয়ে ভাবছিলেন।
প্রত্যেক মহান প্রতিভাবানের নিকট সম্ভবত কল্পনাশক্তি নামের এক অদৃশ্য ক্ষমতা থাকে, যা তাকে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।।ওপেনহেইমারের কাছেও এমনই কিছু ছিল। ব্ল্যাকহোল নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার পূর্বেই ছিল।তিনি জানতেন যে,যখন একটি তারা অভিকর্ষের প্রভাবে বিলুপ্ত হয় তখন সেটি দানবীয় সুপারনোভা বা ব্যাকহোল হয়ে উঠতে পারে।বোমাকেও তিনি ভীষণ চাপে রেখে সর্বোচ্চ ভরে পৌঁছিয়ে কি ঘটে তা দেখতে চেয়েছিলেন।তিনি এই বিষয়ে অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে শেষ চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।তিনি জানতেন যখনই এটি চরম ভরে পৌঁছে যাবে তখনই এটির বিস্ফোরিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।এটিই ছিল প্লুটোনিয়াম বোমার আসল রহস্য। এই ইমপ্লশন হচ্ছে সেই সমাধান যার জন্য আমেরিকান বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছিলেন।
১৯৪৪ সালে জার্মানির বিরুদ্ধে মিত্র বাহিনীর একের পর এক আক্রমণ হিটলার ও তার নাৎসি বাহিনীকে কোনঠাসা করে ফেলে।অন্যদিকে হাইজেনবার্গকে তার ব্যর্থতার জন্য বার্লিনে ডেকে আনা হয়।তার উপর ভরসা করে হিটলারের শ্রম,টাকা,সময় নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।উনার ২য় বার চেষ্টা করতে চাওয়ার আবেদনও নাকচ করে দেওয়া হয়।হাইজেনবার্গ ১৯৪৪ সালে নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ডে একটি সেমিনারে বক্তব্য রাখতে আসেন।তখনই যুক্তরাষ্ট্রে সুযোগটি কাজে লাগাতে চাইল যাতে জার্মানি বোমা আবিষ্কার করতে না পারে। কারন আমেরিকার কাছে হাইজেনবার্গের বোমা আবিষ্কারের বিষয়ে কোন সুস্পষ্ট ধারনা ছিল না। তাছাড়া জার্মানদের কাছে ছিল হাইজেনবার্গের মত বিজ্ঞানী যা যুক্তরাষ্ট্রে জন্য যথেষ্ট ভয়ের কারণ ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রে হাইজেনবার্গকে হত্যা করে জার্মানির বোমা আবিষ্কার বন্ধ করার কৌশলের সিদ্ধান্ত নিল।
২য় বিশ্বযুদ্ধের আগে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সি.আই.এ ছিল না কিন্তু তাদের পূর্বসুরীরা ঠিকই ছিল।মো বার্ক ছিলেন প্রাক্তন বেসবল খেলোয়াড় যিনি সাচ্ছন্দ্যে জার্মান ভাষা বলতে পারতেন।একই সাথে তিনি আমেরিকার একজন দক্ষ গুপ্তচর ছিলেন।তিনি ছদ্দবেশে সেমিনারে উপস্থিত হন হাইজেনবার্গের বক্তৃতা শুনার জন্য এবং অপেক্ষা করতে থাকতে কখন হাইজেনবার্গ পারমাণবিক আবিষ্কারের বিষয়ে কিছু বলবেন।মূলত তিনি অপেক্ষায় ছিলেন যে, হাইজেনবার্গ কখন বলবেন যে তারা পারমানবিক আবিষ্কার করে ফেলেছে এবং যুদ্ধ কিছু দিনের মধ্যে জিতে যাবে।তখনই বার্ক গুলি করে হাইজেনবার্গকে হত্যা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন । কিন্তু হাইজেনবার্গ কিছুই বলেন নি এই বিষয়ে।তাই সেমিনার শেষে বার্ক বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গের পিছু নেন।কিন্তু হাইজেনবার্গ তখন তাকে নাৎসিদের গুপ্তচর মনে করে ভুল করে বসলেন।বার্ককে তিনি পিছু না নিয়ে হিটলার ও তার বাহিনীকে গিয়ে বলতে বলেছিলেন,, যদি তারা বোমা পেতে চায় তাহলে হাইজেনবার্গকে গবেষণা করার ব্যবস্থা ও লোক দিতে।এই কথা শুনে বার্ক বুঝে ফেললেন, জার্মানরা পারমাণবিক আবিষ্কার করতে পারে নি।বার্ক উল্টো ঘুরে চলে গেলেন হাইজেনবার্গকে হত্যা না করে।হাইজেনবার্গের গবেষনাগার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তিনি কাজে বেশি দূর এগোতে পারেন নি।তিনি দক্ষিন জার্মানিতে নিজেই পারমাণবিক আবিষ্কার করার জন্য একটি ছোট গবেষনাগার তৈরী করলেন।কিন্তু হাতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও টাকা না থাকায় কাজে উন্নতি করতে পারলেন না।
১৯৪৫ সালে মিত্র বাহিনী ও সোভিয়েতরা জার্মানিকে পরাস্ত করতে করতে রাজধানী বার্লিন পর্যন্ত এসে পড়ে।তারা বার্লিনের সবকিছু ধ্বংস করে দিতে থাকে।১৯৪৫ সালেই দক্ষিন জার্মানিতে গবেষনাগার থেকে আটক হন হাইজেনবার্গ ও তার সাথের বিজ্ঞানীরা।তাদের আটক করে ইংল্যান্ডে গোপন জায়গায় আটকে রেখে পারমানবিক আবিষ্কারের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।তাদের উত্তর শুনে সবাই বুঝতে পারে জার্মানরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছে বোমা আবিষ্কার করতে এবং এতে মিত্র বাহিনীতে স্বস্তি ফিরে আসে।
১৯৪২-৪৫ তিন বছর চেষ্টার পর রবার্ট ওপেনহেইমার ও তার দল ১টি ইউরেনিয়াম ও ২ টি প্লুটোনিয়াম বোমা আবিষ্কার করেন।কিন্তু প্লুটনিয়ামটি বোমা কাজ করবে কি না তা নিয়ে ওপেনহেইমাররা সন্দেহে ছিলেন।তাই একটি বোমা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কালো, ধূসর বর্নের দেখতে গোলাকার গোলকের ভিতরে প্লুটোনিয়ামকে ঘিরে ছিল ২২০০ কিলো বিস্ফোরক ও একটি সূক্ষ্ম ডিটোনেটর। এই বোমাগুলিকে গেজেট নামে ডাকা হত।বোমার বিস্ফোরণের বিষয়ে যেমন তাদের সন্দেহ ছিল তেমনি আবার ভয়ও ছিল যদি বিস্ফোরণ ঘটে তাহলে কি ঘটতে পারে?
![]() |
| চিত্রঃ ট্রিনিটি টেস্টের বিস্ফোরণের সময়। |
রবার্ট ওপেনহেইমার এই পরীক্ষার নাম দেন ট্রিনিটি টেস্ট এবং ট্রিনিটি নামটি তিনি বিখ্যাত কবি জন ডানের কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিয়েছিলেন। ১৬ জুলাই, ১৯৪৫ সালে যূক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের অ্যামোগোর্দোর কাছে পরীক্ষাটি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।টাওয়ার থেকে সতের হাজার গজ দূরে অবস্থান করেছিল মূল শিবির। বিজ্ঞানীরা অনুভব করছিলেন যে তাঁদের হিসাব নিকাশ সঠিক তাই বোমাটির বিস্ফোরণও অবধারিত। কিন্তু একই সাথে প্রত্যেকের মনের গভীরে বেশ জোরালো সন্দেহও লুকিয়ে ছিল। রেডিওতে গণনা তখন১০, ৯, ৮ এ ভাবে শূনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। নিস্তব্ধ কক্ষে এখন শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে কয়েকটি সূর্যের আলোর সমান দিপ্তীতে বিদ্যুৎ চমকের মত উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো গোটা মরুভূমি। প্রায় দু’শ মাইল পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা গেল জলন্ত বহ্নিশিখার আলো। পৃথিবীর বুকে প্রথম বিষ্ফোরিত হলো পারমানবিক বোমা এবং মানুষের সৃষ্টি প্রলয়।ওপেনহাইমার এই বিষয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন“উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ হেসেছিলেন, কয়েকজন কেঁদে ফেলেছিলেন, তবে বেশীরভাগ ছিলেন স্তব্ধ।” পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় সংগৃহীত উপাত্ত থেকে জানা গিয়েছিল, যে রকম আশা করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী হয়েছে বিষ্ফোরণ। গ্রোভস সমরমন্ত্রী স্টিমসনকে জানিয়েছিলেন যে, ১৫০০০ থেকে ২০০০০ টন টি.এন.টি. সমতুল্যের বিষ্ফোরণ ঘটেছে। যে ইস্পাতের টাওয়ারটির সাথে বোমাটি বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সেটি প্রচন্ড উত্তাপে বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছিল।অবশেষে রবার্ট ওপেনহাইমার আবিষ্কার করে ফেলেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও বিধ্বংসী বোমা।তিনি সফল হলেন তার স্বপ্ন পূরণে এবং আমেরিকা প্রথমে শিখতে পারে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরী করার কৌশল।
![]() |
| জার্মানির আত্মসমর্পণ করার সময়ের ছবি। |
১৯৪৫ সালে জার্মানী ও ইতালি যুদ্ধে আত্মসমর্পন করলেও জাপান তখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল।নিশ্চিত পরাজয় জেনেও তারা আত্মসমর্পন করছিল না।তারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং আত্মসমর্পনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল। অবশেষে বাধ্য হয়ে ১৯৪১ সালে আমেরিকার সামরিক ঘাটি পার্ল হারবার আক্রমণের প্রতিশোধ ও যুদ্ধ চিরতরে বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে একটি বিমান ১৯৪৫ সালের ৬ই আগষ্ট জাপানের দিকে উড়ে যায়।প্রেসিডেন্ট এস ট্রু ম্যান ঘোষণা দেন, যুদ্ধের হিংস্রতা বন্ধ করে মানুষের জীবন বাচাতে একটি পারমাণবিক বোমা জাপানের হিরোশিমাতে ফেলা হচ্ছে।হাইজেনবার্গ শুনে বলছিলেন, এটি নিশ্চয়ই আমেরিকা নাটক করছে কারন পারমানবিক বোমা আবিষ্কারের সমস্ত হিসাব আমরা করেছি।এটি ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে কারও পক্ষে বানানো সম্ভব নয়।হাইজেনবার্গ কোনভাবেই নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছিলেন না।প্রথম বোমাটি হিরোশিমায় নিক্ষেপের ঠিক তিনদিন পরে ২য় বোমাটি নাগাসাকিতে ফেলা হয়। এই ২ টি পারমানবিক বোমা নিক্ষেপের পর জাপান আত্মসর্মপনে বাধ্য হয় এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধের ইতি ঘটে।হিরোশিমা ও নাগাসাকির বিস্তৃত ধ্বংসস্তুপ ও ২ লাখের উপর মৃত্যু দেখে পৃথিবীর সব মানুষের শরীর শিউরে উঠেছিল।
![]() |
| নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের পরের ছবি। |
হাইজেনবার্গ যুদ্ধ চলাকালে নাৎসিদের সাহায্য করলেও তাকে কখনো দোষী সাব্যস্ত করা হয় নি।তাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে দেশ পুর্নগঠন ও ইউরোপের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিজ্ঞানকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর জন্য কাজে এবং অধ্যাপনা করার সুযোগ দেওয়া হয়।তিনিও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন এবং সঠিকভাবে কাজে মনোনিবেশ করে পরবর্তীতে শান্তিকামী বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক মুখ হয়ে উঠেছিলেন।
অন্যদিকে রর্বাট ওপেনহেইমার পারমানবিক বোমা আবিষ্কারের জনক হিসেবে খ্যাতি পান।কিন্তু
হিরোশিমা ও নাগাসাকির অবস্থা দেখে পারমাণবিক বোমার জনক ওপেনহেইমারও প্রচন্ড ব্যথিত হন।
![]() |
| পারমাণবিক বোমায় ধ্বংসস্তূপ হিরোশিমার ছবি |
ওপেনহেইমারের প্রতি এই আচরন সমগ্র দেশকে আলোড়িত করেছিল।এই ঘটনার পর ম্যানহাটন প্রজেক্টে কর্মরত ৪৯৩ জন বিজ্ঞানী একযোগে স্বাক্ষরকরে ওপেনহেইমারের পক্ষে তাদের প্রতিবাদলিপি প্রেরণ করে। তবে ৯ বছর নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হয় তাকে হাইড্রোজেন বোমার বিপরীতে অবস্থানের জন্য। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বি. জনসন ওপেনহেইমারকে আণবিক শক্তি কমিশনের এনরিকো ফার্মি পুরস্কার প্রদান করেন।১৯১৪ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে বিশ্ব যেখানে ২টি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে, এই আবিষ্কারই মূল কারন যা সম্ভবত এখন পর্যন্ত থামিয়ে রেখেছে ৩য় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকে।"পারমানবিক বোমার আবিষ্কার "একদিকে যেমন অভিশাপ তেমনি অন্যদিকে আশীর্বাদও বটে।।(ভাল লাগলে পেইজে লাইক ও শেয়ার দিয়ে সাথে থাকবেন)










1 Comments
This comment has been removed by the author.
ReplyDelete