আমেরিকা আবিষ্কার, বর্নবাদের ইতিহাস, বর্নবাদীদের হাতে খুন হওয়া সফল প্রেসিডেন্ট ও নোবেলজয়ী নেতা এবং প্রতিবাদী সাহিত্যক সর্ম্পকে জানার জন্য লিখাটি পড়তে পারেন।
১৪৯২ সাল।সমুদ্রযাত্রায় একজন নাবিক আমেরিকা আবিষ্কার করেন।তার নাম ক্রিস্টোফার কলম্বাস।সেই থেকেই ইউরোপীয়দের শাসনে বন্দি হয়ে যায় আমেরিকা এবং এই বন্দি দশা থেকে মুক্তি মিলে যখন আমেরিকা ব্রিটিশদের অধীনে ছিল।১৭৭৬ সালে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পায় আমেরিকা। এই স্বাধীনতা লাভ মোটেও কোন সহজ বিষয় ছিল না।আমেরিকা আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে আমেরিকায় আসলেও ধীরে ধীরে আমেরিকায় বসতি স্থাপন করে ইউরোপীয়রা।আমেরিকার আদি বাসিন্দা রেড-ইন্ডিয়ানদের আটক, বিতাড়িত, হত্যা ও তাদের ভূমি দখল করে তারা।তখন থেকেই দাস হিসেবে আফ্রিকা থেকে অজস্র মানুষকে আনা হত আমেরিকা। সবচেয়ে বেশি মানুষকে দাস হিসেবে আমেরিকায় আনা হয় ব্রিটিশদের সময়ে।তাদের আনা হত মূলত চাষাবাদ, কৃষিকাজ সহ উন্নত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করার উদ্দেশ্যে ।সুতরাং আজকের পরাশক্তি আমেরিকা গঠিত হওয়ার পিছনে কালো বর্নের মানুষের অবদান সাদা বর্নের আমেরিকানদের অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।আফ্রিকানদের দাস হিসেবে কাজ করানোর উদ্দেশ্যে নিয়ে দাস প্রথার প্রচলন আমেরিকায় শুরু করে তারা।বর্নবাদের যে বীজ আমেরিকার ভিতর ইউরোপীয়রা বপন করেছিল তা আজও দৃশ্যমান যার বহিঃপ্রকাশ বর্তমানের এই সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাটি।
উনবিংশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর অংশে শিল্পের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় এবং এই অঞ্চলে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে জনমত তৈরী হতে থাকে।অপরদিকে দক্ষিনের অর্থনীতি কৃষি নির্ভর হওয়ার তাদের দাসপ্রথার প্রয়োজনতা তারা উপলব্ধি করতে পারে এবং তারা দাসপ্রথার পক্ষে জনমত তৈরী করতে থাকে।এই বিরোধ চরম আকারে পৌছায় ১৯৬০ সালে।
১৯৬০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একজন পদপ্রার্থী দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার এজেন্ডা নিয়ে নির্বাচন করার সাহস করেন এবং তিনি জয়ী হন। তিনি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬ তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন।মূলত শিল্প ও সংস্কৃতিতে এগিয়ে থাকা উত্তর অংশের ভোটেই জয়ী হন তিনি।জয়ী হয়েই তিনি দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার জন্য কাজ শুরু করেন। কিন্তু এতে দক্ষিনের রাজ্যগুলো বিরোধিতা শুরু করে এবং লিংকন সংবিধান পরিপন্থী কাজ করছে বলে অভিযোগ করে তারা।কিন্তু মার্কিনীদের সংবিধানে ধর্ম ও বর্নের বৈষম্য না থাকার বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।দক্ষিনের প্রথমে ৭ টি এবং পরে ৪ টি মোট ১১ টি রাজ্য একাত্মতা ঘোষনা করে এবং স্বাধীনতার ডাক দেয়।হঠাৎ করেই লিংকনের ফেডারেল সৈন্যবাহিনীর উপর বিরোধীরা আক্রমণ করে বসে এবং পরাজিত করে।২য় বারেও একই ঘটনা ঘটে এবং তখন উত্তরের ২৩ টি রাজ্য লিংকনের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করে। ২য় বারেও কনফেডারেটসরা বা বিরোধীরা ফেডারেল বাহিনীকে কোনঠাসা করলে আব্রাহাম লিংকন ৫ লক্ষ সেনা প্রেরনের অনুমতি দেন এবং কনফেডারেটসদের পতন শুরু হয়।১৯৬৩ সালের ১ জুলাই লিংকন দাসপ্রথা দিবস পালন করেন যার ফলশ্রুতিতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি হয় এবং দক্ষিনের প্রায় ২ লাখ কালো বর্নের লোক ফেডারেল বাহিনীতে যোগ দেয়।অবশেষে ১৯৬৫ সালের ২৬ এপ্রিল ক্যারোলিনায় কনফেডারেটস সেনাপতির আত্নসমর্পণের মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
আব্রাহাম লিংকনের রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় তখন দাসপ্রথা আইন বিলুপ্ত হয় এবং আমেরিকা বিভক্ত হওয়া থেকে বেচেঁ যায়।
কিন্তু লিংকন শুধুমাত্র আইন বিলুপ্ত করতে পারলেও হয়ত ভাবতেই পারেননি যে, পরবর্তীতে বর্নবাদের রোষানলের শিকার হবে সেই দাসপ্রথা থেকে মুক্তি পাওয়া মানুষেরা। হয়ত ভেবেছিলেন কিন্তু কিছু করার সময়টাও তিনি পান নি।১৯৬৫ সালেই দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার কারনে গুলি করে হত্যা হয় আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্টকে।তিনি এখনো তারঁ বিখ্যাত ২ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের গেটেসবার্গের ভাষনের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে। এই ভাষনেই পাওয়া যায় গণতন্ত্রের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা।
উনিশ শতকে বর্ণবাদে আক্রান্ত আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের পক্ষে যারা কলম ধরে ছিলেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন ল্যাংস্টন হিউজ। কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে গড়ে উঠা হারলেম রেনেসাঁর মূল ছিলেন তিনি।নিজেদের আফ্রিকান-আমেরিকান বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তিনি তার কবিতায় । উনার কবিতার মাধ্যমেই উনি তুলে ধরেছিলেন বর্নবাদের অভ্যন্তরীণ অনেককিছুরই বিস্তারিত।উনার বাবা ছিলেন শেতাঙ্গ এবং মা ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ।বাবা কিংবা মা কারও সাথেই থাকা হয়নি তার।উনি দারোয়ান,বাবুর্চি, ড্রাইভার,নাবিক হয়েও পরে গ্রাজুয়েট সম্পন্ন করেন। উনি রান্নার কাজ করতেন একটি শেতাঙ্গ মালিকের বাসায়।বাসায় মেহমান আসলে তাকে রান্নাঘরে লুকিয়ে থাকতে হত।কারন
কৃষ্ণাঙ্গ কেউ যদি চাকর হিসেবেও থাকত কোন বাসায়, ওই বাসায় শেতাঙ্গরা কেউ আসত না।কিন্তু উনি রান্নাঘরে থেকে ভাল খাবার খেয়ে নিজেকে শক্তিশালী করে শেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতেন।তিনি আগামীতে তাদের সাথে টেবিলে বসে খাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।তিনি নিজেকে শেতাঙ্গদের কালোভাই বলতেন। তিনি নিজেও শেতাঙ্গদের সাথে মিলে আমেরিকার উন্নয়নের জন্য কাজ করার কথা বলতেন।উনার কবিতার এসব কিছুই উঠে এসেছে।এছাড়া বর্নবাদের ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি,অবিচার, নির্যাতন, বৈষম্য, একসাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ইত্যাদি রয়েছে তার কবিতায়।
কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বেশি কাজ করে যাওয়া ব্যাক্তিটির নাম মার্টিন লুথার কিং। ১৯৫০ এর মধ্যবর্তী সময় থেকে আমৃত্যু তিনি ছিলেন আমেরিকান সিভিল রাইট মুভমেন্টের নেতা। ১৯২৯ সালে জন্মগ্রহন করা এই কিংবদন্তি পৃথিবী জুড়ে তার বিখ্যাত ভাষন "I have a dream" এর জন্য বেশি জনপ্রিয়।তিনি সেই ভাষনে বলেছিলেন,,
"আমার একটি স্বপ্ন আছে, সেটি আমার ৪ টি ছোট বাচ্চা একদিন এমন একটি সমাজে বাস করবে যেখানে তাদের শরীরের রং নয় বরং তাদের মূল্যায়ন করা হবে তাদের কর্মের দ্বারা।"
কিন্তু দুঃখের বিষয় উনাকেও আততায়ীর গুলিতে প্রান হারাতে হয়েছিল।তার জনপ্রিয়তা, নোবেল শান্তি পুরস্কারও তার প্রান বাচাতে পারে নি তাঁর।
২০১৫ সালের একটি জরিপে দেখা যায়,শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গসহ প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জন আমেরিকান মনে করেন বর্তমানের বর্ণবাদী অবস্থা খারাপ, আর প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৪ জন মনে করেন দেশে বর্ণবাদ বিষয়ক আচরণ আরো খারাপ দিকে যাচ্ছে। এই জরিপ নিউইয়র্ক টাইমস ও সিবিএস নিউজের পক্ষ হতে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্নবাদের যে বীজ আমেরিকা আবিষ্কারের পর বপন করা হয়েছিল তা লিংকন,লুথার কিংদের মত কিংবদন্তিরা যেখানে তুলতে পারে নাই, সেখানে বর্তমান প্রজন্মের পক্ষে অসম্ভবই বটে। আন্দোলন,সংগ্রাম, ভাংচুর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বর্নবাদের সাথে পরিচয় ও বর্নবাদের শিক্ষা ছাড়া অন্যকিছু যে দিবে না, সেটা বললে কোন ভুল হবে না।যতদিন পর্যন্ত শেতাঙ্গরা তাদের মন এবং মস্তিষ্ক পরিশুদ্ধ করে কৃষ্ণাঙ্গদের পাশে এসে দাড়ানোর মত মনোভাব অর্জন করতে পারবে না ততদিন অবধি পৃথিবীটাতে বর্নবৈষম্য নির্মূল করা সম্ভব হবে না।(ভাল লাগলে পেইজে লাইক ও শেয়ার দিতে ভুলবেন না)






0 Comments