![]() |
| তুরস্কের বুকাতে রুমির ভাস্কর্য |
৬০৪ হিজরীর ৬ রবিউল আউয়াল মােতাবেক ১২০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টম্বর এ মহামনীষী বর্তমান আফগানিস্তানের বলখ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ। পিতা ছিলেন তৎকালের স্বনামখ্যাত কবি ও দরবেশ। জানা যায় পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালিদের পাণ্ডিত্যের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে পারস্যের রুম প্রদেশের অন্তর্গত কুনিয়ার তৎকালীন শাসনকর্তা আলাউদ্দিন কায়কোবাদ মনীষী বাহাউদ্দিনকে কুনিয়ায় আমন্ত্রণ করে পাঠান।আমন্ত্রণ পেয়ে বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ সপরিবারে কুনিয়ার চলে যান এবং রাজনৈতিক কারণে তিনি সেখানে বাসস্থান নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এ রুম প্রদেশের নাম অনুসারে তিনি রুমী ’ নামে খ্যাতি লাভ করেন।
৫ বছর বয়স থেকেই মাওলানা রুমী (রঃ) এর মধ্যে বিভিন্ন অলৌকিক বিষয়াদি পরিলক্ষিত হতে থাকে। বাল্যকালে তিনি অন্যান্য ছেলেমেয়েদের ন্যায় খেলাধূলা ও আমােদ প্রমােদ লিপ্ত থাকতে পছন্দ করতেন না। তিনি সর্বদা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আলােচনা পছন্দ করতেন। ৬ বছর বয়স থেকেই তিনি রােজা রাখতে শুরু করেন। ৭ বছর বয়সে তিনি সুমধুর কন্ঠে পবিত্র কোরআন বিশুদ্ধভাবে তেলাওয়াত করতেন। কোরআন তেলাওয়াতের সময় তার দু'নয়নে অশ্রুধারা প্রবাহিত হত। সম্ভবত এ বয়সেই তিনি কোরআনের মর্মবাণী ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি অনুধাবন করতে পারতেন। কথিত আছে মাওলানা রুমী (রঃ) এর বয়স যখন ৬ বছর তখন পিতা বাহাউদ্দিন বালক রুমী (রঃ) কে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ইরানের নিশাপুরে যান এবং
সেখানে বিখ্যাত দার্শনিক ও কবি শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তাবের সাক্ষাৎ লাভ করেন। শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তাব বালক জালাল উদ্দিনের মুখচ্ছবি দেখেই তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত বুঝতে পেরে তার জন্যে দোয়া করেন এবং তাঁর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখার জন্যে পিতাকে উপদেশ দেন। নিশাপুর ত্যাগ করে পিতা বাহাউদ্দিন রুমী (রঃ) কে সঙ্গে নিয়ে পবিত্র হজ্জ সম্পাদন করেন এবং বাগদাদসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। পিতা নিজেই তাঁর পুত্রকে আধ্যাত্মিক জ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতে লাগলেন। শিক্ষা লাভের প্রতি তাঁর ছিল পরম আগ্রহ।
![]() |
রুমির কবিতা খচিত প্রতিবিম্ভ পেয়ালা, ১৩শতকের প্রথমদিকে।ব্রকলিন মিউজিয়াম
|
উদ্দিন পিতৃ শােকাকুল মাওলানা রুমী (রঃ) কে শিক্ষা দান করেন। এরপর উচ্চতর শিক্ষা লাভের জন্যে তিনি চলে যান প্রথমে সিরিয়া ও পরে দামেস্কে। তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭ বছর অধ্যয়ন করেন। এছাড়া জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ৪০ বৎসর বয়স পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে। তিনি তাঁর শিক্ষা জীবনে তৎকালীন যুগ শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সাহচর্য লাভ করেন। তিনি যাদের থেকে জ্ঞান লাভ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে শামসুদ্দিন তাব্রীজ (রঃ), ইবনে আল আরাবি(রঃ), সালাউদ্দিন ও হুসামউদ্দিন এর নাম উল্লেখযােগ্য। জালাল রুমী (রঃ) এত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন যে, তৎকালীন সময়ে তাঁর সাথে অন্য কারাে তুলনা ছিল না।। কথিত আছে ১২৫৯ সালে চেঙ্গীস খানের পৌত্র হালাকু খান যখন বাগদাদ অধিকার করে তদীয় সেনাপতি কুতববেগকে দামেস্কের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। তখন দামেস্কবাসীদেরকে সহযােগিতা করার জন্যে ধ্যানযােগে তিনি দামেস্কে উপস্থিত হয়েছিলেন।
পিতার মৃত্যুর পর রুমী (রঃ) পিতার গদীনশীন হন। বিন্নি দেশ থেকে তাঁর নিকট আগত হাজার হাজার লােকদেরকে তিনি শিক্ষাদান করেন। তিনি বহু কিতাব লিপিবদ্ধ করেছেন। তার গ্রন্থাবলীর মধ্যে মসনবী ' ও' দিওয়ান ' তাকে অমর করে রেখেছে। বাংলা ভাষাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তাঁর গ্রন্থ মসনবী' অনূদিত হয়েছে।এই বইটি ১২৪ টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কবিদের মধ্যে যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হচ্ছে, তিনি হচ্ছেন জালাল উদ্দীন রুমী (রহ) । আলেমগণ আজও বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় আলােচনা সভায় তাঁর রচিত কবিতা আবৃত্তি করে শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে থাকেন।
![]() | ||
| উভয়পৃষ্ঠা অঙ্কিত প্রচ্ছদ, প্রথম বই কবিতা সংকলন “মসনবী”, ১৪৬১ পাণ্ডুলিপি |
নয়। আল্লাহকে বুঝতে ও চিনতে হলে ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রয়ােজন। তাহলেই অন্তর দিয়ে আল্লাহকে অনুধাবন করতে পারবে।মানুষ যখন মা'রেফাতের উর্ধ্বতন স্তরে উন্নীত হয়ে আপনার
ভিতর আল্লাহর প্রকাশ অনুভব করে তখন তাঁর ব্যক্তিত্বের সীমা কোথায় ভাসিয়ে যায়। তিনি
তখন অসীমের ভিতর আপনাকে হারিয়ে ফেলেন। কিংবা তিনি নিজের সীমার ভিতরই অসীমের
সন্ধান লাভ করেন। তখন তিনি আনন্দে বিভাের হয়ে সবকিছুকে একেবারেই তুচ্ছ বােধ করেন। মারেফাতের স্তর উন্নীত হলে আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে আর কোন ভেদাভেদ থাকে।এ অবস্থার নাম হলাে ' হাল'। এ কথাগুলাে পৃথিবীর মানুষের সামনে পেশ করে গেছেন মাওলানা রুমী (রঃ)। ইহজগতে থেকে মানবাকৃতি বজায় রেখে মানুষ কিভাবে অস্তিত্বহীন হতে পারে তা মাওলানা রুমী (রঃ) দেখিয়েছেন।
মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী (রঃ) ভাগ্য ও পুরস্কার সমস্যার সহজ সমাধান দিয়েছেন।তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সকল কার্যের নিয়ন্তা আল্লাহ। কিন্তু এর সংগে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে, আল্লাহ পাক মানুষকে কতকগুলাে কার্যের পূর্ণ স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাধিকার দিয়েছেন, যার সীমারেখার মধ্যে মানুষ নিজেই তার কর্মপন্থা নির্বাচনের অধিকারী। এ সকল কার্যাদির কর্মফলের জন্য মানুষ নিজেই দায়ী। কারণ এগুলাে করা না করা তারই স্বেচ্ছাধিকার ভূক্ত, যদিও কর্ম করার শক্তি আল্লাহই মানুষকে প্রদান করেছেন।
রুমী (রঃ) ছিলেন তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী।রুমী (রঃ) খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তিনি দুনিয়ার ভােগ বিলাস ও ঐশ্বর্যকে তুচ্ছ মনে করতেন। তিনি যে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন সে তুলনায় দুনিয়া তুচ্ছ হওয়াটাই স্বাভাবিক। মৃতু কালে তার কোন সঞ্চিত ধন-সম্পদ ছিল না। ৬৬ বহুর বয়সে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অসুস্থতার সংবাদ প্রচারিত হবার সাথে সাথে চতুর্দিক হতে হাজার হাজার লােক গভীর উদ্বেগের সাথে ছুটে আসে। তৎকালীন বিখ্যাত চিকিৎসক শেখ সদরউদ্দিন, আকমাল উদ্দিন ও গজনফার তার চিকিৎসা করে ব্যর্থ হন। এ সময় রুমী (রঃ) চিকিৎসক শেখ সদরউদ্দিন সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন, “ আশেক ও মাশুকের মধ্যে একটি মাত্র পর্দার ব্যবধান রয়েছে। আশেক চাচ্ছে তার মাশুকের নিকট চলে যেতে।পর্দাটা যেন দ্রুত উঠে যায়।” শেখ
সদরউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন, রুমী (রঃ) এর আয়ু শেষ হয়ে আসছে; অর্থাৎ রুমী (রঃ)
আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার জন্য তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরপর তিনি তাঁর শিষ্যদের সান্ত্বনা
দিয়ে কিছু উপদেশ দিলেন, যার কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলাে:
ইন্দ্রিয় লালসাকে কখনাে প্রশ্রয় দিবে না। পাপকে সর্বদা পরিহার করবে। নামাজ ও রোজা কখনাে কাযা করবে না। অন্তরে ও বাহিরে সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলবে। বিপদে ধৈর্যধারণ করবে। বিদ্রোহ ও প্রতিশােধমূলক মনােভাব পােষণ করবে না। নিদ্রা ও কথাবর্তায় সাধ্যানুযায়ী সংযমী হবে। কাউকে কোন প্রকার কষ্ট দিবে না। সব সময় সৎ লােকদের সংস্পর্শে থাকবে।মনে রাখবে, মানুষের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ, যার দ্বারা দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হয়।তারপর তিনি বললেন, মানুষের দেহ নশ্বর কিন্তু তার আত্মা অবিনশ্বর। এ নশ্বরদেহ ধ্বংস প্রাপ্ত হয় বটে; কিন্তু তার ভিতর যে অবিনশ্বর আত্মা রয়েছে তা চিরকালই বেঁচে থাকে।এরপর এই বিখ্যাত মনীষী ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ই ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। এ সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।






0 Comments